১৮তম বিজেএস (লিখিত) পরীক্ষা: স্বপ্নজয়ের পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত গাইডলাইন-by Judge Nazmul Hasan(11th BJS, Prime Minster Gold medalist)

১৮তম বিজেএস (লিখিত) পরীক্ষা: স্বপ্নজয়ের পূর্ণাঙ্গ বিস্তারিত গাইডলাইন



বিচারক হওয়ার এই যুদ্ধ কেবল মেধার নয়, এটি সঠিক কৌশল এবং মানসিক দৃঢ়তার। আপনার প্রতিটি পদক্ষেপকে সফল করতে নিচের পয়েন্টগুলো বিস্তারিতভাবে অনুসরণ করুন:

. রুটিন সময়ের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা

১. টাইট শিডিউল বিরতি: পরীক্ষা শুরু হবে ২৫ এপ্রিল ২০২৬ এবং চলবে মে ২০২৬ পর্যন্ত। পুরো ১০ দিনের এই ম্যারাথনে আপনি কেবল মে (শুক্রবার) একটি দিন বিরতি পাবেন। এর মানে হলো, আপনার হাতে নতুন কিছু পড়ার বা বিশ্রামের সুযোগ খুব কম। তাই প্রতিদিনের পড়ার রুটিন এমনভাবে করুন যেন কোনো সময় নষ্ট না হয়।

২. পরীক্ষার রুটিন সময় সম্পর্কে স্বচ্ছতা: প্রতিদিন পরীক্ষা দুপুর :৩০ থেকে বিকাল :৩০ পর্যন্ত। আপনার মস্তিষ্কের 'পিক পারফরম্যান্স' এই সময়ে নিশ্চিত করতে হবে। রুটিনটি প্রিন্ট করে পড়ার টেবিলের সামনে রাখুন যাতে তারিখ বা বিষয় নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি না হয়।

. পরীক্ষার খাতায় নম্বর বাড়ানোর কৌশল

. আপনার 'নম্বর জোন' চিনুন: কিছু বিষয় আছে যেখানে অংকের মতো নম্বর পাওয়া যায়। যেমন: গণিত, সাধারণ বিজ্ঞান, বিশেষ আইন (Special Law), বাংলা ইংরেজি ব্যাকরণ এবং মুসলিম হিন্দু আইনের উত্তরাধিকার। এই বিষয়গুলোতে সামান্য ভুল মানে অনেক নম্বরের পার্থক্য। এগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন।

. বিজ্ঞানে চিত্র ডায়াগ্রাম: বিজ্ঞানের উত্তর কেবল বর্ণনামূলক করবেন না। যেখানেই সম্ভব পেন্সিল দিয়ে পরিষ্কার চিত্র বা ফিগার আঁকুন। একটি সঠিক চিত্র আপনার উত্তরের মান কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

. তথ্যচিত্র বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি: বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির উত্তরে কেবল প্যারাগ্রাফ না লিখে টেবিল, ফ্লো-চার্ট বা বক্স ব্যবহার করুন। উত্তরের নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে দেশি-বিদেশি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বা আইনজ্ঞদের প্রাসঙ্গিক উক্তি (Quotes) ব্যবহার করুন।

. সঠিক প্রাসঙ্গিক মামলা (Case Law): আইন বিষয়ের উত্তরে মনগড়া কথা না লিখে সঠিক 'কেস রেফারেন্স' দিন। বিশেষ করে নাম এবং সাল যেন নির্ভুল থাকে।

. সাম্প্রতিক সংশোধনীর ওপর জোর: বিজেএস সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত আইনগুলোর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে যে পরিবর্তন বা সংশোধনী এসেছে, সেগুলো উত্তরের মাঝে অবশ্যই উল্লেখ করবেন। এটি প্রমাণ করে আপনি আইনের সমসাময়িক পরিবর্তনের সাথে আপডেট আছেন।

. সময় বণ্টন পরিকল্পনা: ঘণ্টার পরীক্ষায় প্রতিটি প্রশ্নের জন্য কত মিনিট সময় পাবেন, তা পরীক্ষা শুরুর আগেই মনে মনে ঠিক করে নিন। একটি প্রশ্নে বেশি সময় দিয়ে অন্যটি অপূর্ণ রাখা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

. আন্তর্জাতিক সাংবিধানিক গভীরতা

. আন্তর্জাতিক বিষয়ের বিশেষ ফোকাস: বর্তমানে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং এই সংকটের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি দক্ষিণ এশিয়ায় (বিশেষ করে বাংলাদেশে) কী প্রভাব পড়ছে, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখুন।

১০. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: সাংবিধানিক আইনের ক্ষেত্রে 'মাসদার হোসেন মামলা' এবং 'মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন মামলা'-কে ভিত্তি ধরে সাম্প্রতিক রায় আইনের আলোকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বর্তমান চিত্র তুলে ধরুন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ টপিক। 

. উত্তরপত্রের নান্দনিক উপস্থাপনা

১১. পয়েন্টভিত্তিক উত্তর: যদি কোনো প্রশ্নের কয়েকটি অংশ থাকে (যেমন: , , ...), তবে সেগুলো উত্তর দিতে অগ্রাধিকার দিন। এতে প্রতিটি অংশের জন্য আলাদা নম্বর পাওয়া সহজ হয়।

১২. IRAC মেথড ব্যবহার: সমস্যাধর্মী প্রশ্ন (Problematic Questions) সমাধানের সময় Issue (মূল সমস্যা), Rule (সংশ্লিষ্ট আইন), Analysis (বিশ্লেষণ) এবং Conclusion (সিদ্ধান্ত)—এই চার ধাপে উত্তর লিখুন।

১৩. উত্তর ছোট করবেন না: আপনার কাছে যদি সঠিক এবং মানসম্মত তথ্য থাকে, তবে উত্তর  ছোট করবেন না। পর্যাপ্ত তথ্য দিয়ে উত্তরটি সমৃদ্ধ করুন।

১৪. নীল কালির ব্যবহার হাইলাইটিং: উত্তরপত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। মামলার রেফারেন্স, ল্যাটিন শব্দ বা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো নীল কালির কলম দিয়ে লিখুন যাতে পরীক্ষকের নজরে পড়ে।

১৫. সময় অপচয় রোধ: পরীক্ষার হলে এক সেকেন্ড সময়ও নষ্ট করবেন না। কোনো প্রশ্ন না পারলে তা নিয়ে বসে না থেকে পরেরটিতে চলে যান।

. ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা প্রযুক্তি বর্জন

১৬. ফোন ফেসবুক থেকে দূরত্ব: পরীক্ষার দিনগুলোতে ফেসবুক বা স্মার্টফোন আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু। এই কদিন ভার্চুয়াল জগত থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকুন।

১৭. নেতিবাচক প্রভাবমুক্ত থাকা:  আপনার প্রস্তুতি কেমন বা পরীক্ষা কেমন হচ্ছে, তা এমন কারো কাছে বলবেন না যারা আপনার ভালো চায় না। নিজের পরিকল্পনা নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখুন।

১৮. ঈর্ষাকাতর বন্ধুদের বর্জন: কিছু বন্ধু থাকে যারা আপনার আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। এই পরীক্ষার সময়টুকুতে তাদের থেকে ১০০ হাত দূরে থাকুন।

১৯. হলের বন্ধুত্ব বাইরে রাখুন: পরীক্ষা কেন্দ্রে কারো সাথে খোশগল্প করবেন না। আপনার পুরো মনোযোগ থাকবে শুধু আপনার খাতার ওপর। মনে রাখবেন, হলের ভেতর সবাই আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী।

২০. অতীতের পরীক্ষা নিয়ে চিন্তা নয়: একটি পরীক্ষা শেষ হওয়া মানে সেটি অতীত। পরীক্ষা কেমন হলো তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে পরের পরীক্ষার সময় নষ্ট করবেন না। যা হয়ে গেছে, তা আর ফেরানো যাবে না; সামনের পরীক্ষার দিকে তাকান।

. মানসিক শারীরিক স্বাস্থ্য

২১. আতঙ্কিত হবেন না: প্রশ্ন কঠিন হলে ঘাবড়ে যাবেন না। মনে রাখবেন, প্রশ্ন কঠিন হলে সবার জন্যই কঠিন। শান্ত থাকলে আপনি যা জানেন তাও সুন্দরভাবে লিখে আসতে পারবেন।

২২. সুস্থতা সুষম খাবার: এই সময়ে অসুস্থ হওয়া মানে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া। তাই বাইরের খাবার পরিহার করুন, প্রচুর পানি পান করুন এবং সুষম খাবার খান।

২৩. পর্যাপ্ত ঘুম: রাত জেগে পড়ার চেয়ে মস্তিষ্কের বিশ্রাম বেশি জরুরি। প্রতিদিন অন্তত ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের চেষ্টা করুন।

২৪. নিজের সামর্থ্যে বিশ্বাস: কখনো নিজের যোগ্যতার ওপর সন্দেহ করবেন না। আপনি আপনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন, এখন শুধু তার প্রতিফলন ঘটানোর সময়। নিজের সাথে প্রতারণা করবেন না।

. আধ্যাত্মিকতা পরম মমতায় ঘেরা দোয়ার জগৎ

২৫. সিজদায় সমর্পণ আল্লাহর সাহায্য: প্রতিটি দিনের শুরুতে এবং কলম ধরার আগে আপনার সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করুন। আপনার দীর্ঘদিনের শ্রম, চোখের জল আর নির্ঘুম রাতের সাক্ষী কেবল তিনিই। মনে রাখবেন, মেধা আর পরিশ্রম আপনি করেছেন, কিন্তু সেই শ্রমের সার্থকতা দেওয়ার মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। তাঁর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখলে মনের ভেতর এক অলৌকিক প্রশান্তি অনুভূত হবে।

২৬. মা-বাবার দোয়ার ছায়া: পরীক্ষা দিতে বের হওয়ার আগে মা-বাবার   দোয়া নিন। আপনার বিচারক হওয়ার স্বপ্নটি কেবল আপনার একার নয়, তাঁদের সারা জীবনের সাধনা। পৃথিবীতে যদি কোনো অজেয় শক্তি থাকে, তবে তা হলো মা-বাবার চোখের কোণে জমা হওয়া আনন্দাশ্রু আর অন্তরের গভীর থেকে আসা দোয়া। এই দোয়াই আপনার সব কঠিন পথকে সহজ করে দেবে।

২৭. জীবনসঙ্গীর ভালোবাসা সহমর্মিতা: আপনি যদি বিবাহিত হন, তবে আপনার জীবনসঙ্গী এই সংগ্রামের পথে আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁর ত্যাগ, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর আপনার পাশে থেকে সাহস জোগানোর সেই মুহূর্তগুলোকে শ্রদ্ধার সাথে মনে করুন। তাঁর হাত ধরে বলা একটি কথাই হতে পারে আপনার ক্লান্ত মস্তিষ্কের শ্রেষ্ঠ সঞ্জীবনী। তাঁর বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে হলেও আপনাকে সফল হতে হবে।

২৮. নিভৃত রাতের তাহাজ্জুদ: যখন সারা দুনিয়া ঘুমে মগ্ন,  এই নিস্তব্ধতায় চোখের লোনা জলে নিজের সাফল্যের আর্জি পেশ করুন। তাহাজ্জুদের জায়নামাজে যে সাহস আর স্থিরতা অর্জিত হয়, তা পৃথিবীর কোনো মোটিভেশনাল স্পিচ দিতে পারবে না। এটি আপনার অন্তরে এক অপরাজেয় নূর বা আলোর সঞ্চার করবে।

২৯. বাবা-মায়ের জন্য একটি মহান বিজয়: আপনার এই লড়াইটি তাঁদের জন্য, যাঁদের আঙুল ধরে আপনি হাঁটতে শিখেছেন। যদি আপনার বাবা-মা বেঁচে থাকেন, তবে কল্পনা করুন সেই দিনটির কথাযেদিন আপনার নামের আগে 'বিচারক' শব্দটি দেখে তাঁদের বুক গর্বে  ভরে উঠবে। আর যদি তাঁরা আজ পরপারে থাকেন, তবে বিশ্বাস রাখুনতাঁরা জান্নাতের বাতায়ন দিয়ে আপনার প্রতিটি সংগ্রাম দেখছেন। আপনার একটি 'সাফল্য' তাঁদের আত্মাকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেবে।  

. শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সতর্কতা

৩০. জরুরি সব পেপার সাথে রাখা: অ্যাডমিট কার্ড, রেজিস্ট্রেশন কার্ড এবং কলম আগের রাতেই গুছিয়ে রাখুন।

৩১. নির্দেশনা সিট প্ল্যান: রুটিনের নিচে লেখা  নির্দেশনাবলি খুব ভালো করে পড়ুন। বিজেএস ওয়েবসাইট থেকে আপনার আসন বিন্যাস বা সিট প্ল্যান আগেভাগেই নিশ্চিত হয়ে নিন।

৩২. সঠিক সময়ে কেন্দ্রে পৌঁছানো: জ্যাম বা অন্য কোনো বিপত্তি এড়াতে নির্দেশিত সময়ের অন্তত ৩০-৪০ মিনিট আগে কেন্দ্রে পৌঁছান।

৩৩. পরবর্তী ভাইভার প্রস্তুতি: লিখিত পরীক্ষার আইন বিষয়ের প্রশ্নগুলো সংগ্রহে  রাখুন। লিখিত পরীক্ষার পরপরই এই  প্রশ্নগুলো আপনাকে ভাইভা পরীক্ষায় দারুণ সাহায্য করবে।

৩৪. কোনো পড়া জমিয়ে না রাখা: পরীক্ষার আগের রাতে সব শেষ করবএমন চিন্তা করবেন না। আগেভাগেই সিলেবাস শেষ করে রিভিশন দিন।

৩৫. পরীক্ষা নিখুঁতভাবে শেষ করা: নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে পরীক্ষাটি শেষ করুন। এটি কেবল আপনার নয়, আপনার পুরো পরিবারের স্বপ্ন।

৩৬. অযথা প্যানিক না হওয়া: পরীক্ষা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করবেন না। মাথা ঠান্ডা রেখে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে যান।

৩৭. বিজেএস আপডেট: বিজেএস  ওয়েবসাইটের দিকে নিয়মিত নজর রাখুন যাতে কোনো জরুরি নোটিশ মিস না হয়।

৩৮. সফলতার দিকে যাত্রা: মনে রাখবেন, আপনার প্রতিটি ঘাম এবং নির্ঘুম রাত আপনাকে 'বিচারক' নামক সেই মহান মর্যাদার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।


আপনার কলম চলুক বিজয়ের টানে। ১৮তম বিজেএস ব্যাচে আপনার সাফল্য সুনিশ্চিত হোক!  

 

About the Author

Judge Nazmul Hasan

Senior Judicial Magistrate & Senior Civil Judge, 11th BJS.

Judge Nazmul Hasan is a distinguished member of the 11th Bangladesh Judicial Service (BJS), currently presiding over complex civil and criminal litigation as a Senior Civil Judge /Senior Judicial Magistrate.  

Academic Excellence & Distinguished Honors

A scholar of the highest caliber, Judge Hasan’s academic trajectory is marked by historic achievements. He secured 7th position in the competitive 11th BJS national merit list and holds a First Class First (LL.B. Hons) and a First Class (LL.M) from the University of Rajshahi, Bangladesh.  His commitment to legal excellence has been recognized by the highest levels of the State, earning him the prestigious Prime Minister Gold Medal (2017) and the Agrani Bank Gold Medal for Academic Excellence (2023).

 

Comments

Popular posts from this blog

100 Legal Maxims for 18th BJS Exam and Law Students.

BJS প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় সফল হওয়ার টিপস: প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ