বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিচারব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত: বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ, ২০২৬ এর একটি তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিশ্লেষণ

 

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিচারব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত: বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ, ২০২৬ এর একটি তাত্ত্বিক ব্যবহারিক বিশ্লেষণ

বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গতিশীল করার জন্য বাণিজ্যিক বিরোধসমূহ দ্রুত কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি করা অপরিহার্য এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে সংবিধানের ৯৩() অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে "বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ, ২০২৬" জারি করেন এই আইনটি বাংলাদেশের দেওয়ানি বিচারব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, যা দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও সহজতর করবে


বিষয়বস্তুর সূচি

  • ভূমিকা: বাণিজ্যিক আদালতের প্রয়োজনীয়তা প্রেক্ষাপট
  • . বাণিজ্যিক বিরোধের সংজ্ঞা পরিধি: কী কী এই আদালতের আওতাভুক্ত?
  • . বাণিজ্যিক আদালত গঠন বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া
  • . আদালতের ভৌগোলিক বিষয়ভিত্তিক এখতিয়ার
  • . আপিল রিভিশন পদ্ধতি: দ্রুত বিচার নিশ্চিতের কৌশল
  • . মধ্যস্থতা (Mediation): বিরোধ নিষ্পত্তির বিকল্প বাধ্যতামূলক পথ
  • . মামলা ব্যবস্থাপনা (Suit Management) দ্রুত বিচারের বিশেষ বিধান
  • . তথ্যপ্রযুক্তি আধুনিক বিচারিক অবকাঠামো
  • . বিদ্যমান মামলার হস্তান্তর আইনি প্রাধান্য
  • উপসংহার: বাণিজ্যিক উন্নয়নের পথে একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ

. বাণিজ্যিক বিরোধের সংজ্ঞা পরিধি: কী কী এই আদালতের আওতাভুক্ত?

অধ্যাদেশের () ধারায় বাণিজ্যিক বিরোধের একটি বিস্তৃত তালিকা দেওয়া হয়েছে সাধারণ দেওয়ানি বিরোধ থেকে একে আলাদা করার জন্য ২৪টি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে

গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষেত্র উদাহরণ:

  • ব্যবসায়ী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লেনদেন: ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাধারণ ব্যবসায়িক লেনদেন
    • উদাহরণ: একটি টেক্সটাইল মিল যদি কাঁচামাল কেনার জন্য এলসি (LC) সংক্রান্ত জটিলতায় পড়ে, তবে তা বাণিজ্যিক বিরোধ।
  • পণ্য বা সেবার রপ্তানি-আদানি: আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে পণ্য আদান-প্রদান
  • নির্মাণ অবকাঠামো চুক্তি: বড় বড় ফ্লাইওভার বা সেতু নির্মাণের দরপত্র সংক্রান্ত বিরোধ
  • বৌদ্ধিক সম্পদ (Intellectual Property): ট্রেডমার্ক, কপিরাইট বা পেটেন্ট সংক্রান্ত অধিকারের দাবি
    • উদাহরণ: যদি কোনো কোম্পানি অন্য একটি কোম্পানির লোগো বা ব্র্যান্ড নাম অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করে, তবে সেটি এই আদালতের অধীনে আসবে।
  • যৌথ উদ্যোগ শেয়ারহোল্ডার চুক্তি: ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অংশীদারদের মধ্যে বিরোধ

বিশেষ দ্রষ্টব্য: হাইকোর্ট বিভাগের আদি অধিক্ষেত্র এবং অর্থ ঋণ আদালতের এখতিয়ারাধীন বিষয়গুলো এই আদালতের আওতায় পড়বে না


. বাণিজ্যিক আদালত গঠন বিচারক নিয়োগ

ধারা অনুসারে, সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী বাণিজ্যিক আদালত গঠন করবে

  • বিচারক: জেলা জজ বা অতিরিক্ত জেলা জজ পর্যায়ের বিচারকগণ এখানে নিযুক্ত হবেন
  • যোগ্যতা: নিয়োগের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক আইনে উচ্চশিক্ষা বা এই বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিচারকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে
  • আপিল বেঞ্চ: প্রধান বিচারপতি হাইকোর্ট বিভাগে এক বা একাধিক বিশেষ "বাণিজ্যিক আপিল বেঞ্চ" গঠন করবেন

. আদালতের এখতিয়ার সীমাবদ্ধতা

বাণিজ্যিক আদালতের নিজস্ব ভৌগোলিক এলাকা থাকবে তবে, যদি অন্য কোনো আইন দ্বারা দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ার স্পষ্টত নিষিদ্ধ থাকে, তবে বাণিজ্যিক আদালতও সেই বিষয় গ্রহণ করতে পারবে না (ধারা )


. আপিল রিভিশন পদ্ধতি

দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে এই অধ্যাদেশে আপিল প্রক্রিয়া সংকুচিত করা হয়েছে:

  • শুধুমাত্র চূড়ান্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে
  • অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের বিরুদ্ধে কোনো আপিল চলবে না, তবে দেওয়ানি কার্যবিধি অনুযায়ী রিভিশন বা রিভিউ দায়ের করা যাবে
  • সময়সীমা: রায় বা আদেশের ৬০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল বা রিভিশন দাখিল করতে হবে

. মধ্যস্থতা (Mediation): একটি বাধ্যতামূলক বিকল্প

এই অধ্যাদেশের সবচেয়ে আধুনিক দিক হলো "প্রি-স্যুট মিডিয়েশন" বা মামলা দায়েরের পূর্ববর্তী মধ্যস্থতা

  • মামলার আগে: যদি জরুরি কোনো অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিকারের প্রয়োজন না থাকে, তবে বাদীকে অবশ্যই মামলা করার আগে মধ্যস্থতার চেষ্টা করতে হবে
  • মামলা চলাকালীন: আদালতের অনুমতি নিয়ে পক্ষগণ ৩০ দিনের মধ্যে মধ্যস্থতা শেষ করবেন (প্রয়োজনে আরও ৩০ দিন বাড়ানো যায়)
  • ফলাফল: মধ্যস্থতায় সমঝোতা হলে তা একটি "ডিক্রি" হিসেবে গণ্য হবে এবং আদালতের মাধ্যমে কার্যকর করা যাবে

. মামলা ব্যবস্থাপনা (Suit Management) দ্রুত বিচার

প্রথাগত দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে ধারা - কিছু বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে:

  1. মামলা ব্যবস্থাপনা শুনানি (Suit Management Hearing): জবাব দাখিলের পর প্রথম দিনেই আদালত উভয় পক্ষের আইনজীবীদের সাথে বসে বিচারের ধাপ এবং সময় নির্ধারণ করে দেবেন
  2. সময়ের সীমাবদ্ধতা: কোনো পক্ষ সর্বোচ্চ তিনবার সময় প্রার্থনা করতে পারবে এবং আদালত ৯০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত শুনানি শেষ করবে
  3. সংক্ষিপ্ত বিচার (Summary Judgment): ধারা ১০ অনুসারে, যদি দেখা যায় বিবাদী বা বাদীর জেতার কোনো সম্ভাবনা নেই এবং মৌখিক সাক্ষ্যের প্রয়োজন নেই, তবে আদালত সরাসরি রায় দিতে পারেন
  4. সুদ খরচ: আদালত চুক্তির হার অনুযায়ী বা প্রচলিত ব্যাংক হারের চেয়ে % বেশি হারে সুদ আরোপ করতে পারেন এছাড়া সফল পক্ষকে মামলার খরচ (কোর্ট ফি, আইনজীবী ফি) প্রদানের আদেশ দিতে পারেন

. তথ্যপ্রযুক্তি আধুনিক অবকাঠামো

বাণিজ্যিক আদালতগুলোকে সম্পূর্ণ স্মার্ট এবং ডিজিটাল করার বিধান রাখা হয়েছে:

  • ভার্চুয়াল শুনানি: "আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০" অনুসরণ করে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শুনানি করা যাবে
  • ডিজিটাল কার্যক্রম: মামলা দায়ের, সমন জারি এবং রায় প্রকাশ অনলাইনে করা সম্ভব হবে
  • পরিসংখ্যান প্রকাশ: প্রতি মাসে কতটি মামলা দাখিল নিষ্পত্তি হলো, তা সুপ্রীম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে

. আইনি প্রাধান্য স্থানান্তর

  • অধ্যাদেশের প্রাধান্য: অন্য কোনো আইনের সাথে এই অধ্যাদেশের বিরোধ দেখা দিলে এই অধ্যাদেশের বিধানই কার্যকর হবে
  • মামলা স্থানান্তর: এই অধ্যাদেশ কার্যকরের পর সাধারণ দেওয়ানি আদালতে বিচারাধীন সকল বাণিজ্যিক বিরোধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাণিজ্যিক আদালতে স্থানান্তরিত হবে

উপসংহার

বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ, ২০২৬ বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এটি কেবল ব্যবসার বিরোধ মেটানোর জন্য নয়, বরং একটি বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্র গড়ার হাতিয়ার। দ্রুত বিচার, মধ্যস্থতা এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই আইনটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। শিক্ষার্থীদের জন্য এই আইনটি বোঝার মূল চাবিকাঠি হলো এর "দ্রুততা" "বিশেষায়িত" প্রকৃতির অনুধাবন করা।

 

Comments

Popular posts from this blog

17th BJS Viva Preparation by Judge Nazmul Hasan.

100 Legal Maxims for 18th BJS Exam and Law Students.

BJS প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় সফল হওয়ার টিপস: প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ